এবিবি চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন। ছবি: সংগৃহীত
দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’-র সাম্প্রতিক ব্যবস্থাপনা সংকট ও অস্থিরতা পুরো ব্যাংকিং শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্যাংকারদের শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় ইসলামী ব্যাংকের চলমান অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি, ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি এবং ডিজিটাল লেনদেনের সম্প্রসারণসহ সামগ্রিক আর্থিক খাতের একগুচ্ছ এজেন্ডা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বুধবার (১০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ ‘ব্যাংকার্স সভা’ শেষে সংগঠনটির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দ্রুত ‘সমঝোতা’র মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের আহ্বান জানান।
ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা শীর্ষ পদের রদবদলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতা এখন জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ২৪ মে কোরবানি ঈদের আগে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানের আকস্মিক পদত্যাগের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এরপরই ‘গ্রাহক ফোরাম’ ব্যানারসহ বিভিন্ন পক্ষের বিক্ষোভ, পুলিশের বলপ্রয়োগ এবং গত কয়েক দিনে ব্যাংকটি থেকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা আমানত প্রত্যাহারের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো খাতে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়।
ব্যাংকার্স সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এবিবি চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেন, “আমরা ব্যাংকাররা উদ্বিগ্ন। ইসলামী ব্যাংক ঘিরে চলমান অস্থিরতা পুরো ব্যাংকিং শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। দেশের বৃহত্তম ব্যাংকটির সংকট দ্রুত সমাধান হওয়া প্রয়োজন এবং এ জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা জরুরি। আমরা একটি স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চাই; গভর্নরও একই অবস্থানে আছেন।”
তিনি আরও জানান, গভর্নর দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে ব্যাংক খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের আশ্বস্ত করেছেন। মাসরুর আরেফিন বলেন: “গভর্নর বলেছেন, ‘বিষয়টি এখন রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে’। তবে তিনি দ্রুত সমাধানের উপায় খোঁজার বিষয়ে আশাবাদী। গভর্নর সাহেবকে আজকে যেভাবে দৃঢ় দেখলাম, তাতে আমরা আশা করি খুব দ্রুত একটি যৌক্তিক ও টেকসই সলিউশন পাওয়া যাবে।”
এই অস্থিরতা কেবল ব্যাংকিং পাড়াতেই সীমাবদ্ধ নেই, তা গড়িয়েছে জাতীয় সংসদেও। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান অভিযোগ তুলেছেন যে, নতুন চেয়ারম্যান বসানোর পর ফের ব্যাংকটি ‘দখলের চেষ্টা’ হচ্ছে।
এর জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “ব্যাংকটিকে অস্থিতিশীল করে একটি বিশেষ মহল রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।” তবে রাজনৈতিক এই বাদানুবাদের ঊর্ধ্বে উঠে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।
এবারের ব্যাংকার্স সভায় দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির গতি সচল রাখতে ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি কাটাতে একটি বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শিগগিরই ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি ‘বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি’ বা প্যাকেজ চালু করতে যাচ্ছে।
এবিবি চেয়ারম্যান জানান, এই বিশাল তহবিলের একটি অংশ দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বাকি অংশ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সংগ্রহ করা হবে।
তবে বর্তমানে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা থাকায় অর্থ সংগ্রহের কৌশল নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে এবিবি। মাসরুর আরেফিন বলেন, “ক্রেডিট গ্রোথ এখন আমাদের অন্যতম প্রধান ইস্যু। আমরা গভর্নরকে জানিয়েছি কী পদ্ধতিতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সুরক্ষিত রেখে এই অর্থ নেওয়া যেতে পারে।”
আমদানি ও রপ্তানি তথ্যের নির্ভুলতা এবং বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার (ট্রেড-বেজড মানি লন্ডারিং) রোধে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক বাণিজ্য (ট্রেড) বিভাগকে আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে সভায়।
পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ভুল ও বিলম্বিত তথ্য জমার কারণে রাষ্ট্রীয় হিসাব-নিকাশে জটিলতা তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, এখন থেকে আন্তর্জাতিক মূল্যতথ্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পণ্যের প্রকৃত দাম যাচাই করা হবে। এর ফলে ওভার-ইনভয়েসিং বা আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মতো জালিয়াতি কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের আধুনিকায়নে আগামী ১ জুলাই থেকে দেশব্যাপী সব ব্যাংকের জন্য ‘বাংলা কিউআর’ কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
এই প্রযুক্তির প্রসারে এবিবি এবং দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংক সম্মিলিতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিলবোর্ড এবং মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণামূলক ক্যাম্পেইন চালাবে। একই সাথে দ্রুততম সময়ের মধ্যে 'টাকা-পে' ডেবিট কার্ডের পর 'টাকা-পে' ক্রেডিট কার্ড চালু করার ওপর জোর দেন ব্যাংকাররা।
এ ছাড়া ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় পরিচালকদের সশরীরে উপস্থিতির পাশাপাশি ‘হাইব্রিড’ বা ভার্চুয়াল অংশগ্রহণের সুযোগ রাখার ব্যাপারে ব্যাংকারদের দাবির মুখে গভর্নর তাতে ইতিবাচক সায় দিয়েছেন। অন্যদিকে, বহুল বিতর্কিত ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারাটি বাতিলের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং গভর্নর নিজেও এর বিরোধিতা করেছেন বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
