অর্থ মন্ত্রণালয়ে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। প্রতীকী ছবি
রেকর্ড পরিমাণ ঋণের সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এবং বিপুল ভর্তুকির দ্বিমুখী চাপ নিয়ে চূড়ান্ত হচ্ছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। তীব্র মূল্যস্ফীতিতে থাকা সাধারণ মানুষ যখন নিত্যপণ্যের দাম কমানো ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রত্যাশা করছেন, তখন সামষ্টিক অর্থনীতির এই ঋণের বোঝা ও রাজস্ব ঘাটতি সরকারকে এক কঠিন নীতিগত পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আসন্ন বাজেটের সম্ভাব্য আকার হতে পারে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৯ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা, যার সিংহভাগই ব্যয় হবে অতীতে নেওয়া অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের দায় মেটাতে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নতুন বাজেটে শুধু দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সরকারের প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ১৪ টাকাই চলে যাবে সুদের পেছনে, যা কোনো নতুন কর্মসংস্থান বা উন্নয়ন প্রকল্প সৃষ্টি করবে না। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই খাতে ব্যয় ছিল ৬৮ হাজার কোটি টাকা, মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে তা প্রায় দ্বিগুণ হওয়া দেশের ঋণনির্ভর অর্থায়নের উদ্বেগজনক চিত্রটিকেই করে।
বিগত এক দশকে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন, রাজস্ব আদায়ের ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে চড়া সুদে ঋণ নেওয়ার কারণে এই দায়ের সৃষ্টি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের অর্থ যদি পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার না হয়, তবে সেই ঋণের বোঝা সরাসরি জনগণের কাঁধেই এসে পড়ে।
ঋণের সুদের পাশাপাশি সরকারের জন্য দ্বিতীয় বড় উদ্বেগ হলো প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ভর্তুকির চাপ। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল-এলএনজির মূল্যবৃদ্ধির কারণে শুধু বিদ্যুৎ বিভাগই এবার ৫৯ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দাবি করেছে।
বাজেটের এই উভয়সংকট নিয়ে দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ বলেন, “সরকার যদি রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে ভর্তুকি তুলে দেয়, তবে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। আবার পুরো ভর্তুকি দিতে গেলে ব্যাংক খাত থেকে বিপুল ঋণ নিতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি বিনিয়োগকে স্থবির করে তুলবে। এই মুহূর্তে রাজস্ব ব্যবস্থার গভীর সংস্কার ছাড়া বিকল্প কোনো সহজ পথ খোলা নেই।”
বাংলাদেশের বাজেট ব্যবস্থাপনার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো উন্নয়ন ব্যয়ের চেয়ে পরিচালন ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি। গত ১৬ বছরে জাতীয় বাজেটের গড় বাস্তবায়ন হার ছিল মাত্র ৮৪ শতাংশ এবং বাজেট কাটছাঁটের প্রথম কোপটি পড়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি)। গত অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ৫৪ শতাংশ, অথচ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন ও সুদের মতো পরিচালন ব্যয় প্রায় শতভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো দীর্ঘমেয়াদি জনকল্যাণমূলক খাতগুলো ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর আদায় না হওয়ায় সরকারকে বাজেট ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে, সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার দাবি করা হলেও, বাজার বাস্তবতায় খাদ্যপণ্য, চিকিৎসা ও পরিবহনের উচ্চমূল্যে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার সংকট কাটেনি।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেটটি কেবল একটি গতানুগতিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে বর্তমান করোনাত্তর ও বৈশ্বিক সংকটের আবহে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই করার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। জ্বালানি খাতের অপচয় রোধ, ব্যাংক খাতের সুশাসন এবং করের আওতা না বাড়িয়ে করের জাল বিস্তৃত করার ওপরই নির্ভর করছে সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন ও এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
