বিশ্ববাণিজ্যে মার্কিন আধিপত্য ও শুল্ক নীতির মারপ্যাঁচে অস্থির আন্তর্জাতিক বাজার, ট্রাম্পের অনমনীয় শুল্ক হার এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ের টানাপোড়েনে সংকটে উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানি খাত। গ্রাফিকস: সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিবস’ তথা বিশ্বব্যাপী পাল্টা শুল্ক আরোপের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা এক বড় ধরনের আইনি ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে। ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ১৫৭টি দেশের পণ্যে যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, তাকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। তবে বিচারিক এই প্রতিবন্ধকতায় দমে না গিয়ে ট্রাম্প পুনরায় ভিন্ন আইনি পথে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের এই অনমনীয় অবস্থান বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থায় এক গভীর অনিশ্চয়তা ও সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী শুল্ক যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ট্রাম্পের বাণিজ্য দর্শনের মূলে রয়েছে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা। তাঁর মতে, ভিয়েতনাম বা চীনের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করে বিপুল মুনাফা করলেও মার্কিন পণ্যের ক্ষেত্রে উচ্চ শুল্কের বাধা তৈরি করে রেখেছে। এই ‘অন্যায্য’ রীতির জবাবে তিনি ‘জাতীয় জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন’ (IEEPA) ব্যবহার করে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন। চীনকে লক্ষ্য করে তিনি বলেছিলেন, তাদের ৬৭ শতাংশ শুল্কের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। মূলত অন্যান্য দেশের উচ্চ শুল্ক হারের অর্ধেক পরিমাণ শুল্ক পাল্টা আরোপ করাই ছিল ট্রাম্পের কৌশল।
মার্কিন সর্বোচ্চ আদালত প্রেসিডেন্টকে জরুরি আইনের অপব্যবহারের দায়ে অভিযুক্ত করলেও ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে বিকল্প পথের অভাব নেই। রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প জানান, ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ নম্বর ধারা ব্যবহার করে তিনি সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক পুনরায় কার্যকর করতে পারেন। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নতুন এই প্রক্রিয়ায় হয়তো কিছুটা সময় লাগবে এবং তদন্তের প্রয়োজন হবে, কিন্তু শুল্ক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রশাসন বিচ্যুত হবে না।
২০২৪ সালে শুল্ক বাবদ সংগৃহীত প্রায় ২৪০ থেকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার এখন বড় এক বিতর্কের বিষয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই শুল্কের প্রায় ৯০ শতাংশ দায় বহন করতে হয়েছে খোদ মার্কিন নির্মাতা ও ভোক্তাদের। এখন এই বিপুল অর্থ আমদানিকারকদের ফেরত দিতে হলে মার্কিন কোষাগারে টান পড়বে। যদিও বিচারপতি ব্রেট কাভানফ মনে করেন, এই অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং তা দীর্ঘস্থায়ী আইনি লড়াইয়ের দিকে মোড় নিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি অনেকটা ‘ত্রিশঙ্কু’ অবস্থার মতো। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া ১৯ শতাংশ শুল্কের বিশেষ চুক্তিটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে। যদি বৈশ্বিক ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়, তবে বাংলাদেশ হয়তো হারের দিক থেকে কিছুটা সুবিধা পাবে, কিন্তু নীতিগত নিশ্চয়তার অভাবে রপ্তানিকারকরা বড় বিনিয়োগে সাহসী হবেন না।
জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তরের সাবেক পরিচালক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান এই পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ট্রাম্প আন্তর্জাতিক বিধিবদ্ধ বাণিজ্য ব্যবস্থা লঙ্ঘন করে দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন। বাংলাদেশের উচিত হবে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প বাজার, যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মতো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার পথে হাঁটা।
বাণিজ্য ঘাটতির যে ধুয়া তুলে ট্রাম্প প্রশাসন অস্থিরতা তৈরি করছে, তাকে অনেক বিশ্লেষকই ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলে মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্র কেবল পণ্য-বাণিজ্যের হিসাব দিলেও তাদের সেবা-বাণিজ্যে যে বিশাল উদ্বৃত্ত রয়েছে, তা সুকৌশলে এড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালে মার্কিন সেবা-বাণিজ্যের উদ্বৃত্ত ৫ শতাংশ বেড়ে ২৯৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, জাপানিদের তুলনায় মার্কিনদের মাথাপিছু জিডিপি বর্তমানে ১৪৫ শতাংশ বেশি, যা প্রমাণ করে বিপুল পণ্য-বাণিজ্য ঘাটতি থাকলেও মার্কিন অর্থনীতি মোটেও ভঙ্গুর অবস্থায় নেই।
পরিশেষে, ট্রাম্পের এই অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ বিশ্ববাণিজ্যের শৃঙ্খলাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এখন টিকে থাকার মূল মন্ত্র হবে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাজারের সন্ধান করা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
